নামের সঙ্গে পদবি কি খুব জরুরি?

0
185

আমাদের কৈশোরে একটা গান খুব জনপ্রিয় ছিল ‘নামে কি বা আসে যায়, যখন যে নামে খুশি ডেকো গো আমায়’। তখন ফেরদৌসী রহমানের গান ঘরে ঘরে রেডিওতে শোনা যেত। আমাদের স্বল্পশিক্ষিত মায়েরা ফেরদৌসীর নামের সঙ্গে রহমান লাগানোতে ‘এ আবার কী ছিরি!’ বলে হাসাহাসি করতেন।

কারণ, মেয়েদের নামের শেষে বেগম, খানম, খাতুন, নাহার, নেছা-এসবেরই চল ছিল। স্বামী, ভাশুর, শ্বশুরের নাম উচ্চারণ করাও তখনকার গ্রামের নারীদের কাছে পাপ বলে বিবেচিত হতো। সে রকম এক নারীর স্বামীর নাম ছিল মঙ্গল। ওই নারীর দেবরেরা ঠাট্টা করে মঙ্গলবারে জিজ্ঞাসা করতেন, ‘আজ কী বার ভাবি?’ ভাবিও কম যান না। তিনি বলতেন ‘সোমবারের পরদিন’।

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, জাতীয় পরিচয়পত্রে নাম সংশোধনের জন্য চাইলেই নারীরা স্বামীর পদবি ব্যবহার করতে পারবেন না। শিক্ষাসনদ অনুযায়ী যে নাম সেটাই জাতীয় পরিচয়পত্রে থাকবে। যাঁদের সনদ নেই, তাঁদের ক্ষেত্রে মা-বাবা যে নাম রেখেছেন, সেটি হবে। বিশেষ প্রয়োজনে কেউ স্বামীর নাম যুক্ত করতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের অনুমোদন নিতে হবে। কমিশন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত দেবে। এ সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সংবাদপত্রকে জানিয়েছেন, হিন্দুধর্মে বিয়ের পর মেয়েরা গোত্রান্তরিত হয়ে স্বামীর গোত্রপরিচয় ব্যবহার করেন। এতে পদবি পরিবর্তন জরুরি হয়ে পড়ে।

কিন্তু পদবি ব্যবহার কি আজকাল আধুনিকমনস্ক মানুষের কাছে খুব জরুরি? এ ক্ষেত্রে নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে ইসিকে প্রশংসাই করতে হয়। স্বামীর পদবি ব্যবহার না করার বিষয়টিও নারীবাদের আন্দোলনের অংশ। শুধু স্বামীর নামই নয়, পিতার নামের লেজুড়বৃত্তিও পিতৃতন্ত্রকে পুষে রাখার শামিল বলে মনে করা হয়; বরং এ ক্ষেত্রে পদবি-টদবি বাদ দিয়ে সন্তানদের নামের সঙ্গে মায়ের মূল নাম বা অংশবিশেষ সংযোজন করাই শ্রেয়। কারণ, সন্তান ধারণ, জন্মদান ও প্রতিপালনের সবটুকু বেদনা মাকেই বহন করতে হয়।

নামের সঙ্গে পদবি উল্লেখ মানুষে-মানুষে বৈষম্য, অহমিকা, হিংসা ও দূরত্ব রচনা ছাড়া অন্য কোনো শুভবোধের উন্মেষ ঘটায় না। মুসলমানদের মধ্যেও যেমন আশরাফ-আতরাফবোধ রয়েছে, হিন্দুধর্মে তো তা আরও প্রকট। প্রায় শত বছর আগে কাজী ইমদাদুল হক তাঁর আবদুল্লাহ উপন্যাসের মাধ্যমে সমাজে এ বৈষম্যের ক্ষতিকারক প্রভাব তুলে ধরেছিলেন। খন্দকার বংশের এক বেসরকারি অফিসের উচ্চমাধ্যমিক পাস এক কেরানি বিয়ের পাত্রী খুঁজে খুঁজে হয়রান। পঞ্চাশের অধিক পাত্রী দেখা শেষ। শেষ পর্যন্ত উচ্চবংশজাত নয় এমন মাস্টার্স পাস এক পাত্রীর বাবা শুধু পাত্রের উচ্চবংশ বিবেচনা করে প্রস্তাব দিলেন। কিন্তু খন্দকার কেরানিবাবু বললেন, ‘খুনকার (খন্দকারের আঞ্চলিক উচ্চারণ) বংশে প্রবেশ করতে হলে শুধু এমএ পাসই যথেষ্ট নয়।’

সংস্কৃতিমান ছেলেমেয়েরা আজকাল নামের সঙ্গে পদবির ব্যবহার উচ্ছেদ করতে তৎপর হয়েছেন। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত কবি শ্রীজাত তাঁর পদবি উল্লেখ করেন না, যদিও আমরা জানি তিনি ব্রাহ্মণ গোত্রভুক্ত। তেমনি আজকালকার বিভিন্ন গণমাধ্যমের অনেক তারকাই পদবি ব্যবহার করেন না। জানি এটা তাঁদের স্বপ্রণোদিত বর্জন। অনেকে তো অভিনব ছদ্মনামে লিখতে লিখতে সেই নামেই পরিচিতি পেয়ে যান। ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইউসুফ খান দিলীপ কুমার নামে পদবিহীন হয়েও বিখ্যাত হয়েছিলেন। দ্য লোকাল ইন্ডিয়ান নিউজ-এ প্রকাশ, কেরালার এক লাখেও বেশি শিক্ষার্থী ফরম পূরণের সময় ধর্ম ও পদবির ঘর দুটি পূরণ করেনি।

এদিকে আমাদের দেশের কবি-চলচ্চিত্রকার-চিত্রকর টোকন ঠাকুরের নাম ও পদবি দুটোই ছদ্ম। আমাদের একজন কবি নারী তাঁর মেয়ের নাম রেখেছেন ‘রূপে শ্যামলিম’। একজন কবি পুরুষ তাঁর ছেলের নাম রেখেছেন ‘শস্য আবহমান’। একাত্তরের হানাদার বাহিনীর নৃশংসতায় বংশানুক্রমিকভাবে খান পদবি প্রাপ্ত হয়েও আজকের প্রজন্মের অনেকেই কুণ্ঠিত। তাঁরা ওটা ছেঁটে ফেলতে মোটেই দ্বিধা করেন না।

উচ্চবংশজাত একজন মানবিক সংস্কৃতিমান মানুষ চাইবেন না নিম্ন বংশোদ্ভূত কোনো বন্ধু তাঁর সঙ্গে মিশতে সামান্যতম হীনম্মন্যবোধে আক্রান্ত হোক। ইন্টারনেট, ফেসবুক ইত্যাদির কল্যাণে নিজের ইচ্ছামতো নাম রাখার স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারছেন এর সুবিধাভোগীরা। তবে জাতীয় পরিচয়পত্রে যখন যেমন ইচ্ছে নাম পরিবর্তন করা যেমন আইনি জটিলতার সৃষ্টি করবে, তেমনি যিনি যেই নামে পরিচিত হতে চান আইনানুগভাবে তাঁর জন্য সে সুযোগও থাকা উচিত। আসল সমস্যা তো হচ্ছে পদবি নিয়ে। আশা করা যায়, জাতপাতের ছুঁতমার্গ কাটিয়ে উঠতে থাকা আজকের প্রজন্ম কট্টর জাত্যভিমানীদের কবল থেকে মুক্ত হয়ে অদূর ভবিষ্যতে পদবিবিহীন এক সাম্যের পৃথিবী গড়ে তুলবে। তখন নির্বাচন কমিশন এসব বাড়তি জটিলতা থেকে মুক্ত হয়ে তাদের মূল কাজ স্বচ্ছভাবে সময়মতো আমাদের উপহার দিতে পারবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here