দালালি, পদক ও কবির অহম

0
128

মায়ের পেটে থাকতে নাড়িতে প্যাঁচায়ে গেছিলাম। সেই থেকে প্যাঁচানোর স্বভাব। তাই ‘যাহা বলিব প্যাঁচাইয়া বলিব…’।

আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি রেসকোর্সে বুলেটের বেল্ট খুলে জগজিৎ সিং অরোরার হাতে তুলে দিতেই ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের বিজয় ফাইনাল হয়ে গেল। তখন ভেবেছিলাম, এ ম্যাচের খেলোয়াড় আমরা, আম্পায়ারও আমরা। পরে দেখি, ওরে দাদা না! ভুল…সবই ভুল!

এখন বুঝি, এ দেশে কখন কে ‘রানআউট’ হবে, কার কপালে ‘লেগ বিফোর’ জুটবে তার অঙ্গুলি উত্তোলন করছে অন্য আম্পায়ার। কী রাজনীতি,
কী অর্থনীতি, কী সাহিত্য—সবখানে গ্রুপিং। রণে-বনে-জলে-জঙ্গলে—সবখানে দলাদলি। আম্পায়ারের ওপরে থার্ড আম্পায়ার; বাপের ওপরে ঠাকুরদা।

একটা সময় ছিল যখন ‘টাইম টু টাইম’ হরতাল ছিল গণতন্ত্রের কাঁচামাল; গদি ডিমান্ডের টেকনিক। তখন থেকেই রাজনীতিতে পলিটিকসের মারপ্যাঁচ। সাহিত্যেও সীতা-সাবিত্রী নাই।

এ দেশে রাজনীতির গডফাদারদের মতো সাহিত্যেও গডফাদারদের ‘চেইন অব কমান্ড’ আছে। গ্রুপের বিপক্ষে গেলেই সেন্সর ক্যানসার হয়ে দেখা দেয়। তারাশঙ্করের কবি উপন্যাসের নিতাই চরণের মতো ‘চোর ডাকাত বংশের ছেলে হঠাৎ কবি হইয়া’ যাবে—এখন আর তা সম্ভব না। কবি হিসেবে টিকতে চাইলেও আপনাকে ঠিক করতে হবে আপনি কোন গ্রুপে যাবেন।

ধরুন, আপনি নব্বইয়ের দশকে স্বৈরাচারবিরোধী বিরাট বিরাট লম্বা লম্বা কবিতা লিখেছেন। রাউফুন বসুনিয়া, নূর হোসেনের গুলি খেয়ে মরা আপনাকে ক্ষুব্ধ করেছে। আপনি দ্রোহী কবিতা লিখেছেন। রেডিও-টেলিভিশন স্বৈরাচারের সাফাই গেয়েছে—আপনি ঘৃণায় টিভির সুইচ অফ করে দিয়ে মারাত্মক একটা পদ্য লিখে ফেলেছেন। আপনি রোমান্টিক কবি (অব.) হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের তখত্ তাউস কাঁপিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু এখন সেই এরশাদকে মাথায় তুলে ‘কেত্তন’ গাওয়া হচ্ছে। কবি (অব.) এরশাদ ফাঁক পেলেই গণতন্ত্রের ডেফিনিশন হিসেবে ‘গভর্নমেন্ট বাই দ্য পিপল, অব দ্য পিপল, ফর দ্য পিপল’ ঝেড়ে যাচ্ছেন। গণতন্ত্র নিয়ে তাঁর সেই নসিহত আপনাকে বিচলিত করছে না। বরং ভালো লাগছে। বাড়ি মারলেও আপনার হাত দিয়ে এ-সংক্রান্ত কবিতা
বের হচ্ছে না। সরকারের কেউ মন খারাপ করতে পারে এমন কিছু নিয়ে পদ্য মাথায় আসছে না। খালি প্রেম-ভালোবাসা, রংঢং, আকাশ-বাতাস মাথায় আসছে। ভেতরে-ভেতরে আপনি কিটসের সেনসুয়াসনেস আর ওয়ার্ডসওয়ার্থের প্যানথেইজমের একটা ককটেল অনুভূতি ফিল করছেন। এমনটি
হলে বুঝবেন, আপনি ঠিক লাইনে আছেন; কবি হিসেবে আপনার হয়ে গেল! এত দিনে পদক আপনার পেয়ে যাওয়ার কথা। না পেয়ে থাকলে ‘বাঁয় বাঁচিয়ে-ডাইনে রুখে’ লবিংটা ঠিক রেখে এগোন। পয়সা-পদক এল বলে!

রবিঠাকুরের ‘পুরস্কার’ কবিতার কথা মনে আছে তো? ‘মাথার ওপরে বাড়ি পড়ো পড়ো’ দশা থেকে মুক্তির আশায় কবির বউ কবিকে ধরেবেঁধে পাঠিয়েছিলেন রাজদরবারে। সবাই পুরস্কারের ‘টাকা ঝন ঝন ঝনৎকার’ বাজায়ে চলে গেল। রাজা বললেন, সভার কোনায় দাঁড়ানো লোকটা কে? কবি শরমে মরমে বললেন, ‘আমি কেউ নই, আমি শুধু এক কবি।’ কবিতা শুনে মুগ্ধ রাজা যখন তাঁকে বললেন, ‘কী চাও?’ কবির সম্ভ্রান্ত অহম তাঁকে টাকাপয়সা চাইতে দিল না। রাজার গলার ফুলমালা চাইলেন তিনি। কবির সেই সলজ্জ ঔদ্ধত্যের কথা বইয়ে লেখা আছে। এখনো সেটা চর্মচক্ষে দেখার ভাগ্য অন্তত আমার হয়নি।

বছরখানেক আগে ছোটকাগজ ছাপার কাজ নিয়ে গেছি কাঁটাবনের ছাপা-বাঁধাইপাড়ায়। যে প্রেসে গেছি, সেখানে দেখি মোটামুটি বিখ্যাত এক কবি। কথা বলছেন প্রেস মালিকের সঙ্গে। আলাপ শুনে বুঝলাম, কদিন বাদেই তাঁর পঞ্চাশতম জন্মদিন। ঢাকঢোল পেটানো ছাড়াই এমন একটা মাহেন্দ্রক্ষণ সুড়ুৎ করে চলে যাবে—সতীর্থ ও অনুজ সম্প্রদায় তা মানতে নারাজ। জাতির দাবি, বিশেষ প্রকাশনা ও আমোদ-আহ্লাদের মধ্য দিয়ে তাঁর জন্মদিন উদ্‌যাপন করতে হবে। অতিগোপনীয় কথা সলজ্জ হাসির মধ্য দিয়ে ফাঁস করলেন প্রচারবিমুখ এই কবি। একপর্যায়ে তাঁকে নিয়ে বিভিন্ন কবি-লেখকের লেখা ২০ ফর্মার সংকলনের পাণ্ডুলিপি ব্যাগ থেকে ঘ্যাচাং করে বের করলেন। বললেন, এর সঙ্গে পোস্টার, ব্যানার, স্যুভেনির ইত্যাদি ছাপতে হবে। প্রেস থেকে বেরিয়ে তিনি যাবেন পাশের ক্রেস্টের দোকানে। সেখান থেকে তাঁর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে যায়—নিজের নামে এমন একটা ক্রেস্টের অর্ডার দিতে হবে। যে সংগঠনের ব্যানারে এই মহাযজ্ঞ সমাধা হবে, সেই সংগঠনের কাউকে দেখা গেল না। কবি নিজেই ছাপা, বাঁধাইসহ অনুষ্ঠানের সবকিছুর হিসাব করতে ঝড়ের গতিতে ক্যালকুলেটর টিপতে লাগলেন। লেনদেন শেষ করে তিনি এই কবিজীবনে কয়টি মেডেল, কয়টি সম্মাননা পেয়েছেন তার একটা তালিকা পড়ে শোনালেন। কোন কোন সচিব ও আমলার সঙ্গে ‘কাব্য সখ্য’ রাখলে সফল কবি হওয়া প্রায় নিশ্চিত তা তিনি বাতলে দিলেন। আমি শুনলাম এবং বোবা হয়ে গেলাম। বুঝলাম, ‘নিজেরে করিতে গৌরব দান/নিজেরে কেবলই করি অপমান’—এই কথার ভাত উঠে গেছে।

জানলাম, প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার ট্রেন্ড থেকে কবিরা বেরিয়ে এসেছেন। ফুল-পাখি-লতা-পাতার অনুষঙ্গ দিয়ে বিমূর্ত ভাষায় লেখা কবিতার এখন খুব ডিমান্ড। সরকারের উন্নয়ন ও অর্জন নিয়ে লেখা ছড়াও বেশ অর্থকরী ও উপাদেয় হয়ে উঠেছে। পাঠক খাক না খাক, সরকার খেলেই হলো।

একবার সম্রাট নেপোলিয়ন নাকি তাঁর উজির-নাজির-পণ্ডিতদের বলেছিলেন, ‘বলো দেখি এমন কোন ক্ষেত্র আছে যেখানে চাপাবাজির জায়গা নাই?’ প্রাজ্ঞ সভাসদ সেন্ট বিউভ বলেছিলেন, ‘রাজনীতি হলো চাপাবাজির আঁতুড়ঘর। এখানে মহামূর্খেরও রাতারাতি মহাজ্ঞানী হিসেবে নিজেকে জাহির করার সুযোগ আছে। চাপাবাজির সুযোগ সবচেয়ে কম কবিতায়। এখানে যে যতটুকু, সে ততটুকু স্বীকৃতি পাবে। কমও না, বেশিও না।’

মহামান্য সেন্ট বিউভ! অন্যভাবে নেবেন না; আপনি ফেল মেরেছেন। আপনি জানেন না, এখানে স্তাবকতার দামে স্বীকৃতি মেলে। পদক মেলে।

কথা ছিল রাজনীতির গডফাদাররা যখন সমাজকে নর্দমা বানাবে, কবির কলম তখন করাতের মতো অসুন্দরকে ‘সাইজ’ করবে। জীবনের ম্যানহোলগুলোকে মেথরের মতো ‘ক্লিন’ করবে। কিন্তু একদিকে ‘রাজনীতিকের ধমনি শিরায় সুবিধাবাদের পাপ’, অন্যদিকে ‘বুদ্ধিজীবীর রক্তস্নায়ুতে সচেতন অপরাধ।’ আমরা আমজনতা যাবটা কোথায়? কোথায় যাব তা না জানলেও কোথায় আছি তা জানি। আছি আশায়। রাজা উলঙ্গ হয়ে সামনে এলে বালকের সাহস নিয়ে একজন কবি বলবেন, ‘রাজা, তোর কাপড় কোথায়?’ অহমশোভিত সেই কবির আশাতেই ধুঁকছি।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here