টোনাটুনির উভয়সংকট

0
378

আলাদা দুটি পরিবারে আলাদা সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠেন দুজন মানুষ। হৃদয়ের টানে তাঁরা এক হন। বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গড়ে তোলেন সংসার। ছোট্ট সংসারে টোনাটুনির টুকটাক মতবিরোধ হয়তো হয়। আবার সেসব ঝেড়ে দুজনে গলা মিলিয়ে গানও ধরে। কখনো আকাশ মেঘলা হয় তো কখনো রোদ। টোনাটুনি দুই-ই উপভোগ করে। সংসারের আকাশে ডানা মেলে উড়াল দেয়। সুরে সুর মেলায়। কিন্তু মাঝে মাঝে আকাশের ওপার থেকে বাধা হয়ে আসে কালো মেঘ। সেই মেঘ সরাতে হিমশিম খেতে হয় দুজনকে। সংসারের সুর যেন কেটে যায়। বেসুরো লাগে সবকিছু।

এমনি বেসুরো হয়ে পড়েছিল নীলা আর রাকিবের (ছদ্মনাম) সংসার। রাকিবের সঙ্গে নীলার বিয়েটা হয়েছিল পারিবারিকভাবেই। দুই পরিবারের মধ্যে লতায়-পাতায় আত্মীয়তাও ছিল। ফলে দুজনে ভেবেছিলেন, মানিয়ে চলাটা সহজ হবে। কিন্তু হলো তার উল্টো। রাকিবের মা-বাবার ‘জামাই আদরে’ অ্যালার্জি। যখন-তখন রাকিবের শ্বশুর-শাশুড়ির নিমন্ত্রণ। ‘বাবা এটা খাও সেটা খাও বলে’ মাছের মাথা বা মুরগির রান জামাইয়ের পাতে তুলে দেওয়া। এ যেন তাঁদের চক্ষুশূল। আর নীলার মা-বাবা ভাবেন, জামাই মানেই তাঁকে মাথায় তুলে রাখতে হবে। নতুন বিয়ের পর দুই দিন পরপরই এ রকম একেকটা নিমন্ত্রণ আসে। আর তাতে যাওয়া না-যাওয়া নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে শুরু হয় ঠোকাঠুকি। বিয়ের প্রথম এক থেকে দুই বছর এসব নিয়ে তুলকালাম চলেছে। মা-বাবাকে শ্বশুরবাড়ির পক্ষ নিয়ে বোঝাতে গেলেই রাকিবকে বলা হয়েছে, ‘তুই তো ঘরজামাই হয়ে যাচ্ছিস।’

একই অবস্থা নীলারও। মা-বাবাকে বোঝাতে গেলে তাঁরা বলেছেন, ‘ও বুঝেছি! এখন বুঝি তোরা পর হয়ে গেছিস।’ দুই বছর পার হওয়ায় এখন নিমন্ত্রণ কমে এসেছে। তাতেই যেন হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছেন রাকিব। নীলাও খুশি।

প্রথম সন্তানের জন্মের পর আনন্দের শেষ নেই মানস আর মনীষা (ছদ্মনাম) দম্পতির। কিন্তু মেয়ের জন্মের পরই এ কী শুরু হলো? মনীষা ভেবে পান না কী করবেন। মা বলেন, মেয়ের চুল ফেলে দিতে। অপর দিকে শাশুড়ি বলেন, এক মাসের আগে চুল ফেলা যাবে না। মা বলেন, ঘরে তৈরি খাবার খাওয়াতে। আর শাশুড়ি বলেন টিনজাত খাবার খাওয়াতে। মেয়ের নাম রাখার সময় এলে বাবা আর শ্বশুরের মধ্যে প্রায় লড়াই-ই যেন লেগে গেল। বাবা চান মেয়ের নাম হোক প্রচলিত ধারার। আর শ্বশুর চান ইংরেজি নাম। কী উপায় এবার?

দুই পক্ষকে না সামলাতে পারেন মানস, না মনীষা। এত দিন নিজেরা ঠিকই ছিলেন, কিন্তু এখন নিজেদের মধ্যেও এ নিয়ে লেগে যায় ঠোকাঠুকি। শেষমেশ মনীষা আর মানস নিজেদের মা-বাবাকে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, সন্তানের ব্যাপারে সব সিদ্ধান্ত নেবেন তাঁরা। কেবল আদরের ভার ঠাকুরদা-ঠাকুমা আর দাদু-দিদার।

এ ধরনের সমস্যা থেকে বাঁচার উপায় কী? নতুন দম্পতি নিজেরা ঠিকই থাকেন, কিন্তু কেন দুই পরিবার এ ধরনের আচরণ করে? হস্তক্ষেপ করতে চান ছেলে বা মেয়ের নতুন সংসারে। কী মনে করেন সমাজবিজ্ঞানী? জানতে চাইলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক সাদেকা হালিমের কাছে।

সাদেকা হালিম বলেন, ‘অভিভাবকেরা অনেক সময় সন্তানদের নিজেদের সম্পত্তি বলে ভাবেন। ভালো করতে গিয়ে তাঁদের ব্যক্তিজীবনে খুব বেশি নাক গলিয়ে ফেলেন। এর কারণ হতে পারে তাঁরা নিজেরাও একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এসেছেন। এ ধরনের আচরণে অভ্যস্ততার কারণে তাঁরা ভাবেন, এটাই সমাজের রীতি। এটাই ঠিক।’

এমন ক্ষেত্রে স্বামী বা স্ত্রী মা-বাবাকে বোঝাতে পারেন। তবে তাতে সমাধান নাও আসতে পারে। যেমন রাকিব বা নীলা তাঁদের মা-বাবাকে বোঝাতে পারেননি। সমাজবিজ্ঞানী সাদেকা হালিম বলেন, গণমাধ্যমেরও এ ব্যাপারে ভূমিকা আছে। এ নিয়ে আলোচনা হতে পারে, লেখালেখি হতে পারে। বাস্তবতাবর্জিত নাটক বা মেগা সিরিয়ালের বদলে সমাজের এ ধরনের সমস্যা নিয়ে নাটক হতে পারে। প্রয়োজনে মনোবিদের পরামর্শও নেওয়া যেতে পারে। অভিভাবকেরা সন্তানকে অবশ্যই ভালোবাসবেন। তবে সে ভালোবাসা যেন কাঁটা হয়ে না যায়।

বিষয়টি নিয়ে পরামর্শ রয়েছে মনোবিদেরও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কামাল চৌধুরী দিলেন পরামর্শ। বিয়ের পর দুই পরিবারের এ ধরনের আচরণের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, আমাদের সমাজে বিয়ে কেবল দুজন মানুষের মধ্যে হয় না। দুই পরিবারের যোগসূত্র হলো বিয়ে। বিয়ের আগে ছেলে বা মেয়ের ওপর মা-বাবার যে ধরনের প্রভাব বা অধিকারবোধ থাকে, বিয়ের পরও পরিবার সেই ধারাই বজায় রাখতে চায়। এক ধরনের অধিকারবোধ থেকেই তাঁরা এমনটা করে থাকেন। কিন্তু অন্য পরিবার থেকে আসা ছেলে বা মেয়েটির কাছে এ ধরনের পরিস্থিতিতে মানিয়ে চলা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

তবে এ ক্ষেত্রে দ্বন্দ্ব নয় বরং সমঝোতা ও সহনশীলতাই সমাধানের পথ বলে মনে করছেন কামাল চৌধুরী। স্বামী বা স্ত্রী তাঁদের পরিবারকে বোঝাতে পারেন বিয়ের আগের আর পরের পরিস্থিতি এক নয়। এখন তাঁরা আলাদা পরিবারের সদস্য। তাঁদের জীবনযাপনের ধরনও আলাদা। পুরো পরিস্থিতিই তাঁরা ঠান্ডা মাথায় সহনশীলতার সঙ্গে সমাধানের চেষ্টা করতে পারেন।

বিয়ে কেবল দুজন মানুষকে একসঙ্গে বাঁধে না। বাঁধে দুই পরিবারকেও। তাই বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রীর যে সংসার শুরু হয়, তাতে দুই পরিবারের ভূমিকা অবশ্যই থাকবে। ছেলে বা মেয়ের মা-বাবা নিশ্চয়ই পরামর্শ, উপদেশ দেবেন। কিন্তু তা যেন বাড়াবাড়ি না হয়ে যায়। একইভাবে স্বামী বা স্ত্রীকেও মনে রাখতে হবে, মা-বাবা মঙ্গল কামনা করেই এসব বলেন। তাই তাঁদের সঙ্গে রাগারাগি নয়। দুই পক্ষকেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে ধৈর্যের সঙ্গে। তবেই মিলবে টোনা-টুনির সংসারের সাত সুর। বর্ণে, গন্ধে, ছন্দে, গীতিতে চলবে জীবনটা।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here