ছুটির দিনে কাজের কথা নয়

0
301

কর্মব্যস্ত দুনিয়ায় মানুষ দিন দিন রোবটে পরিণত হচ্ছে। একজন চাকুরের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা থাকলেও অনেক সময় দেখা যায়, ছুটির সময়েও তাঁর কাছে প্রতিষ্ঠানের নির্দেশনা আসছে ই-মেইল কিংবা খুদে বার্তাযোগে। এসব বার্তা আবার পড়ে চুপ থাকলেই চলে না, সংশ্লিষ্ট কর্মীকে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সাড়াও দিতে হয়। বিশেষত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ক্ষেত্রে ছুটির সময়েও প্রতিষ্ঠানের ডাকে সাড়া দেওয়ার একধরনের বাধ্যবাধকতা থাকে। কিন্তু এটি সম্ভবত আর সম্ভব হচ্ছে না নিউইয়র্কে। কারণ, এই ধরনের বাধ্যবাধকতা আরোপকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে একটি আইন উত্থাপন করা হয়েছে সম্প্রতি।

এ বিষয়ে ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন বলা হয়, ২০১৭ সালের প্রথম দিন থেকে ফ্রান্সে একটি আইন কার্যকর হয়েছে। এতে ছুটির দিনে প্রতিষ্ঠানের পাঠানো ডাকে সাড়া না দেওয়ার আইনি অধিকার দেওয়া হয় কর্মীদের। ঠিক একই আদলে একটি আইন প্রস্তাব করেছেন নিউইয়র্ক নগরের কাউন্সিলম্যান রাফায়েল এল এসপিনাল জুনিয়র।

গত ২২ মার্চ প্রস্তাবিত এই আইন মূলত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের কথা মাথায় রেখে আনা হয়েছে। আইনে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কোনো কর্মীকে ছুটির সময় ই-মেইল বা খুদে বার্তায় প্রতিষ্ঠান থেকে আসা কোনো নির্দেশে সাড়া দিতে বাধ্য না করার বিষয়ে বলা হয়েছে। একমাত্র জরুরি পরিস্থিতিতেই এটি করা যাবে। এ ছাড়া অন্য সব নির্দেশ অগ্রাহ্য করার অধিকার থাকবে কর্মীদের।

এই বিষয়ে কাউন্সিলম্যান এসপিনাল ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, ‘কর্মীদের সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের সংযোগে সময়সীমার বিষয়টি প্রায় উঠে গেছে। চাকরিদাতাদের জন্য এই কাজটি সহজ করে দিয়েছে প্রযুক্তি। এই আইনের লক্ষ্য হচ্ছে, কর্মীদের অধিকার খর্ব করছে—এমন চাকরিদাতাদের জবাবদিহির আওতায় আনা।’

কিন্তু প্রস্তাবিত এই আইন নিয়ে, এমনকি শ্রম অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে সমালোচনাও উঠেছে। আধুনিক প্রযুক্তি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ব্যক্তিগত জীবনে ব্যাঘাত ঘটার একটি কারণ হিসেবে স্বীকার করলেও তারা প্রস্তাবিত আইনটিকে প্রশ্নসাপেক্ষ বলে মন্তব্য করছেন। অন্য দেশে থাকা কর্মীদের বিষয়ে সমাধানটি কী হবে এবং ওভারটাইম পান না, এমন কর্মীদের ক্ষেত্রেই-বা আইনটি কী সুরক্ষা দেবে, এসবের কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা আইনটিতে নেই বলে মন্তব্য করেছেন সেফার্থ শ-এর অংশীদার রবার্ট হুইটম্যান। শ্রম ও কর্মসংস্থান আইনের এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘নির্দিষ্ট বেতনকাঠামোয় রয়েছেন—এমন কর্মীদের ক্ষেত্রে এই আইন কীভাবে কার্যকর হবে, তা ঠিক বোধগম্য নয়। এই ধরনের কর্মীরা প্রতিষ্ঠানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সে ক্ষেত্রে তারা সাড়া না দিয়ে পারবে না।’

কিন্তু এসপিনাল বলছেন, শুধু ঘণ্টাপ্রতি মজুরিতে কর্মরতদের জন্যই নয়, এই আইনে নির্দিষ্ট বেতনভুক্ত কর্মীদের ক্ষেত্রেও বিধান রাখা হয়েছে। এই আইনের অর্থ এটা নয় যে, কোনো চাকরিদাতা তাঁর কর্মীর কাছে ই-মেইল বা ম্যাসেজ পাঠাতে পারবেন না। এমনকি ওই সব ই-মেইলের বিপরীতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্মীরা সাড়াও দিতে পারবেন। এই আইন শুধু এই বিষয়টি নিশ্চিত করতে চায় যে, ছুটির সময়ে আসা কোনো বার্তা বা নির্দেশে সাড়া না দেওয়ার কারণে কোনো কর্মীর বিরুদ্ধে যেন ব্যবস্থা না নেওয়া হয়। তিনি বলেন, ‘আমি শুধু প্রসঙ্গটি তুলতে চেয়েছি। এই বিষয়ে আইন প্রয়োজন। নিউইয়র্ক শহরে এই নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত।’

কর্মী ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কর্মঘণ্টার বাইরে যোগাযোগের এই সীমা টানার ক্ষেত্রে আরও কিছু সমস্যা রয়েছে। সমস্যাটি একেবারে মূলগত। কর্মঘণ্টার বাইরে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কোনো বিশেষ কাজের কথা বলে ই-মেইল বা ম্যাসেজ পাঠানো কতটা বাধ্যবাধকতা তৈরি করে এবং এই ক্ষেত্রে ওই সংশ্লিষ্ট কর্মী ঠিক কী ভাবছেন, তা নিশ্চিত হওয়ার সত্যিকারের কোনো উপায় নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই বিষয়ে আইনি সংস্থা জ্যাকসন লুইসের কো-চেয়ারপারসন জোনাথন বিং বলেন, ‘এটা সংজ্ঞায়িত করা খুব কঠিন। এই ধরনের যোগাযোগে একজন কর্মী ঠিক কখন নিজেকে বাধ্য বলে মনে করে? এটা কে নির্ধারণ করবে যে, ওই বার্তার বিপরীতে সংশ্লিষ্ট কর্মী নিজে থেকেই সাড়া দিয়েছেন? আর সাড়া না দিলে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিলেও তা তাঁর চাকরিজীবনে পদোন্নতি বা এমন ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, তা নির্ধারণেরই বা উপায় কী?’

তারপরও এই আইনকে অনেকে স্বাগত জানাচ্ছেন। তাঁদের মতে, আইনটি পাসের আগে চাকরিদাতাদের সঙ্গে বসে এই বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ধারণা নিতে হবে। সে ক্ষেত্রে চাকরিদাতারা তাঁদের ঘণ্টা হিসেবে কর্মী কারা, কোন বিভাগের কর্মীদের কর্মঘণ্টা কেমন হবে, এসব নির্ধারণের পাশাপাশি ২৪ ঘণ্টা যোগাযোগ করা যাবে, এমন লিখিত ভাষ্য তুলে ধরতে পারেন।

সংকট আরও রয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বললে এর আওতায় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান কিংবা আইনি সংস্থাগুলোও পড়ে। এই বিষয়ে আইনি প্রতিষ্ঠান ফিশার ফিলিপসের নিউইয়র্ক কার্যালয়ের সহব্যবস্থাপনা অংশীদার মাইকেল মারা বলেন, ‘যেমনটা লেখা আছে, ঠিক সেই রকমভাবেই যদি আইনটি পাস হয়, তাহলে চাকরিদাতারা তাঁদের কর্মীদের সাত দিন ২৪ ঘণ্টা হিসেবে চাকরি দেবেন। এই বিকল্পটি তাঁদের হাতে বৈধভাবেই আছে। কথা হচ্ছে, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এই আইন কার্যকর তেমন কিছু হাজির করছে না।’

মাইকেল মারা আইনটির ‘জরুরি পরিস্থিতি’ সম্পর্কিত বিধানটি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। আইনের ভাষ্যমতে, জরুরি পরিস্থিতিতে যখন তাৎক্ষণিক তৎপরতার প্রয়োজন হয়, তখন এই আইনের ব্যত্যয় করা যাবে। মারা বলেন, ‘প্রশ্ন হচ্ছে, জরুরি পরিস্থিতির সংজ্ঞাটি কে দেবে? আমাদের সবার ওপরেই বস আছে। আর আরেকজনের জরুরি বিষয়কে আমাদের কাছে অনেক সময়ই জরুরি বলে মনে হয় না। আমি এই আইনের অন্তর্বস্তুটি বুঝতে পারছি। কিন্তু এটি আমাকে সত্যিই চিন্তিত করে তুলেছে।’

এসপিনালের প্রস্তাবিত এই আইন শুধু ১০ বা তার বেশি কর্মী রয়েছেন, এমন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে। এর বাইরের প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে নিউইয়র্ক নগরে এরই মধ্যে একটি আইন রয়েছে। আইনটিকে পূর্ণাঙ্গ বলছেন না স্বয়ং প্রস্তাবকারীও। এসপিনালের ভাষায়, ‘আমি বলছি না যে এই প্রস্তাবই চূড়ান্ত। এতে পরিবর্তন আসতে পারে। আশা করি, আসছে গ্রীষ্মে এর ওপর শুনানি হবে। সবাই সেই শুনানিতে অংশ নিয়ে একে গ্রহণযোগ্য করে তুলবে—এটাই প্রত্যাশা।’

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here